প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর পায়নি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সাধুমনি ত্রিপুরা

প্রকাশিত: ২:৩৫ অপরাহ্ণ , মে ১৭, ২০২১

বাদুলা ত্রিপুরা (সংবাদকর্মী একাত্তর টিভি) রাঙ্গামাটির রাজস্থলী থেকে ফিরে:- প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর পাবেন শুনে খুশীতে আত্মহারা হয়েছিলেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সাধুমনি ত্রিপুরা।সেদিন থেকে আজও অব্দি একটি আধা পাকা ঘরের স্বপ্ন দেখে  চলেছেন। এমনকি রাতেও ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখেন তার নামে বরাদ্ধকৃত প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া উপহারের ঘরের কাজ দ্রুত গতিতে এগিযে চলছে।

অফিস খরচ বাবদ ১০০০ টাকা চাওয়া হলে তিনি অন্যের কাছে ধারকর্জ করে  স্থানীয় ইউপি সদস্যের হাতে তুলে দিয়েছিলেন স্বপ্নের সেই ঘরের কথা ভেবে। মনে মনে কতবার সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তার ইয়াত্তা নেই। ভেবেছেন যাক্ এতদিন পরে হলেও একটি একটি শান্তির নীড় পাবেন। ঝড়, বৃষ্টি ঝঞ্চায় নিশ্চিত আশ্রয়ে থাকতে পারবেন।

কিন্তু দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সাধুমনি ত্রিপুরার সেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে ।আজ প্রায় দুবছর পার হয়ে গেলেও প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরের দেখা পায়নি ষাট বছর বয়সী সাধুমনি।

রাঙ্গামাটি জেলার রাজস্থলী উপজেলার ১নং ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের নতুন পাড়ার স্থায়ী বাসিন্দা সাধুমনি। মায়ের কোলে থাকার সময়ে একদূর্ঘটনায় তাঁর বাম চোখের আলো চিরদিনের মতো হারিয়ে যায় সাধুর। বাকি একচোখ দিয়ে বন্ধুর পাহাড়ে বেঁচে থাকার লড়াই করেছেন। পাহাড়ে জুম চাষের মত কঠিন পরিশ্রমের কাজ করে সংসারের হাল ধরে সন্তানদের বড় করেছেন। স্ত্রী থোয়াইংতি ত্রিপুরাকে নিয়ে দুই সন্তানের সংসার। তবে পাহাড়ের নিয়ম অনুযায়ী ছেলেরা বড় হয়ে বিয়ে করে যে যার মত দূরে গিয়ে সংসার করা শুরু করেছে।

বৃদ্ধ বয়সে স্ত্রীকে নিয়ে বহু কষ্টে ১০ বাই ১২ ফুটের বাঁশ আর টিনের তৈরী ঘরে থাকেন। ঘরটি যেনো সুকুমার রায়ের বুড়ির বাড়ির মতো:

ভর দিতে ভয় হয় ঘর বুঝি পড়ে,
খক্‌ খক্‌ কাশি দিলে ঠক্‌ ঠক্‌ নড়ে।
ডাকে যদি ফিরিওয়ালা, হাঁকে যদি গাড়ি,
খসে পড়ে কড়িকাঠ ধসে পড়ে বাড়ি।
ছাদগুলো ঝুলে পড়ে বাদ্লায় ভিজে,
একা বুড়ি কাঠি গুঁজে ঠেকা দেয় নিজে।
মেরামত দিনরাত কেরামত ভারি,
থুর্‌থুরে বুড়ি তার ঝুরঝুরে বাড়ি॥

ব্যাতিক্রম এই ঘরে আছে বুড়ো-বুড়ি। শত জোড়া তালি দেয়া ঘরে দিন পার করছেন তারা। একটু বৃষ্টি হলে, ঝড় ওঠলে যেনো কোনো সময় ভেঙ্গে পরার আশংকায় আছেন। বর্ষায় এখানে সেখানে বাটি রেখে পানি আটকাতে হয়। নয়ন ভিজে যায় পুরে ঘর। শতভাবে ঠেকনা দিয়ে ঘরেটিকে মাটির উপর রাখা হয়েছে।

ছোট বয়সে এক চোখ হারানো সাধুমনির ভালো চোখটিতেও ছানি পড়েছে প্রায় দশ বছর হলো।এখন সবকিছু অস্পষ্ট দেখেন। তাই আগের মত আর কাজ করতে পারেন না। আর সেকারণে দিন মজুরের কাজেও তাকে আর কেউ নিতে রাজী না। আয় রোজগার কোন দিন হয়, কোনো দিন হয় না।দিন কাটে অনাহারে অর্ধাহারে। তার উপর মাথার ছাউনীটাও নড়বড়ে।

 

তাই মুজিববর্ষে গৃহহীন-ভূমিহীনদের ঘর উপহার পাবেন জেনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠেছিলেন সাধুমনি-থোয়াইংতি ত্রিপুরা। দাওয়ায় বসে কথা হয় সাধুমনি ত্রিপুরার সাথে। প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরের কথা জিজ্ঞাসা করতেই সাধুমনি ত্রিপুরা বলেন, দুই বছর আগে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী কোটায় প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরের জন্য তাঁর নাম নেওয়া হয়েছিলো। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরে হাতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেয়ার পর অফিস খরচ বাবদ ১০০০ টাকাও তিনি জমা দেন। কারণ টাকা না দিলে ফাইল এগুবে না। এরপর দিন যায় মাস যায় আর ঘরের দেখা না পেয়ে ঘিলাছড়ি ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে খোঁজ নেন সাধুমনি ত্রিপুরা। ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা টাস্কফোর্স থেকে বলা হয়, “উপজেলা সদর থেকে দূরে হ্ওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর উপরহারের ঘর দেওয়া সম্ভব না! আর যদি ঘরে পেতে হয়, তাদের দিতে হবে ৫০ হাজার টাকা। কারণ ওই টাকায় ঘর তৈরীর মালপত্র পরিবহন করে সাধুমনির বাড়িতে নেয়া হবে সেই খরচ মেটাতেই দিতে হবে টাকা।

 

যার জীবনের পুরো বছরের আয় ২০ হাজার টাকা, তিন বেলা একমুঠো খাবারই জোটাতে পারে না, সে কোথা থেকে দিবে এতো টাকা! তাই ফিরে আসেন সাধুমনি।

পাড়ায় এসে অন্যদের সাথে আলাপ করে জানতে পারেন, পরিবহন ব্যয়ের হিসেবে ৫০ হাজার টাকা করে যারা দিতে পেরেছেন, পেরেছে তাদের ঘর করে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “এই অবস্থা যদি হয় তাহলে গরীবরাতো প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ঘর পাবেনা, কারণ পাহাড়ের গরীবদের কাছে তো এত টাকা নাই!” সামনে বিশাল পাহাড়ের দিকে শূন্যে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘ:শ্বাস ফেলেন সাধু মনি। পাশে বসা তাঁর স্ত্রী থোয়াইংতি।

 

গত ২৩ জানুয়ারী ২০২১ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুজিববর্ষে গৃহহীন-ভূমিহীনদের ঘর উপহার হিসেবে সারাদেশে প্রায় ৬৬ হাজার ১৮৯টি গৃহহীন পরিবারের ঘরের চাবি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। এর অংশ হিসেবে রাঙামাটি জেলায় ভূমিহীন ও গৃহহীন ২৬৮টি পরিবারকে ঘরবাড়ি নির্মাণ করে দেওয়া হয়। তাতে রাঙামাটির ১০টি উপজেলার মধ্যে রাজস্থলী উপজেলায় ৬২ পরিবার ঘরে পেয়েছে।

রাজস্থলী উপজেলায় প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরের জন্য যে ৬২টি পরিবারকে ঘর পেলো, তারা আসলেই গৃহহীণ ও ভূমিহীন ছিল কিনা তা যাচাই বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কর্তব্যরত কর্মকর্তারা গুরুত্ব সহকারে স্বচ্ছভাবে বাছাই করেছিলেন কিনা সে প্রশ্ন রাজস্থলীবাসীর। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী একজন মানুষ শুধু মাত্র রাজস্থলী সদর হতে একটু দূরে হওয়ায় ঘরে পেলো না। যাচাই বাছাইয়ে কোন স্বজনপ্রীতি বা অর্থের বিনিময়ে হয়ে থাকে তাহলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন পূরণ হবে না। গরীব, ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষ সেই গৃহহীনই থাকবে।তুলনামূলক স্বচ্ছল মানুষ মুজিব বর্ষের প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘরে নিয়ে যাবে। এর সুফল প্রকৃত গৃহহীন মানুষের হাতে পৌচ্ছাবে না।